জি এম আমিনুল হক – সাতক্ষীরা:- ভোরের সূর্যের আবির মাখা আলোয় যখন প্রকৃতি সেজেছিল নতুনের সাজে, তখনই সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর (ডি. বি) মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের আমতলায় বেজে ওঠে শাশ্বত সেই সুর— ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। জরাজীর্ণকে ধুয়ে মুছে নতুনকে স্বাগত জানাতে মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বসেছিল প্রাণের মেলবন্ধন। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে দিনভর বর্ণিল উৎসবে মেতেছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সুধীজন।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হওয়ার পর একে একে পরিবেশিত হয় বৈশাখের বন্দনা। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ গানের সাথে নেচে ওঠে কিশোরী শিক্ষার্থীদের মন। শুধু গান নয়, লোকজ সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে আয়োজনে ছিল পুঁথিপাঠ, জারিগান, পল্লীগীতি আর ভাটিয়ালির সুর। দেশাত্মবোধক গান ও কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে ফুটে ওঠে আগামীর জয়গান।অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আবহমান বাংলার হারানো ঐতিহ্য। মাটির কলস আর কুলোর ওপর নিপুণ আলপনা, গ্রামীণ হাটের সেই পুরোনো ‘হালখাতা’র দোকান আর হারিয়ে যাওয়া ‘বায়স্কোপ’ যেন মুহূর্তের জন্য সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল শৈশবের সেই মেলায়। স্কুলের আমতলায় আয়োজিত পান্তা উৎসবে শামিল হয়ে সবাই উপভোগ করেন বাঙালিয়ানার আসল স্বাদ। এর সাথে ছিল বর্ণাঢ্য এক শোভাযাত্রা, যা পুরো এলাকাকে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে দেয়।বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ এমাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় এক মিলনমেলা বসেছিল।প্রধান শিক্ষক মোঃ এমাদুল ইসলাম সকলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “নতুন প্রজন্মকে আমাদের শেকড় ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই এমন আয়োজন। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের মুগ্ধ করেছে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক অনুজিত কুমার মন্ডল, সাবেক অভিভাবক সদস্য রবীন্দ্রনাথ কর্মকার, মিয়ারাজ হোসেন, বিডিএফ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আরশাদ আলী, সমাজ সেবক জাহাঙ্গীর কবির, গ্রাম ডাক্তার জিয়াউর রহমান, সাংবাদিক জিএম আমিনুল হক, মেহেদী হাসান শিমুল, সিনিয়র শিক্ষক মোঃ নজিবুল ইসলাম, এসএম শহীদুল ইসলাম, মোঃ হাফিজুল ইসলাম, শামীমা আক্তার, খালেদা খাতুন, গীতা রানী সাহা, কনক কুমার ঘোষ, অরুণ কুমার মন্ডল, আজহারুল ইসলাম, আসমাতারা জাহান, ভৈরব চন্দ্র পাল, আব্দুল্লাহ আল মামুন, দেলোয়ার হোসেন, লুৎফর রহমান, লুৎফুন্নেছা প্রমুখ। সাংস্কৃতিক পর্বে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আয়ুশী মল্লিক ও ঝিলিক সরকারের সুরেলা কণ্ঠের গান উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করে। হালখাতা মহরত অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহিরা আক্তার মিম, সাবরিন সুলতানা, মারিয়া আক্তার ও জান্নাতুল মাওয়া। শিক্ষক মৃনাল কুমার বিশ্বাসের সুনিপুণ সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও গোছানো।বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন উৎসবের সমাপ্তি ঘটল, তখন সবার মনে একটাই প্রার্থনা নতুনের এই জয়গান যেন সারা বছর ছড়িয়ে পড়ে সবার জীবনে।
Leave a Reply